Latest
Posts

ড্রাইভিং লাইসেন্স আবেদন করার নিয়ম, ফি এবং প্রয়োজনীয় কাগজপত্র

বাংলাদেশে অনলাইনে ড্রাইভিং লাইসেন্স আবেদন করার নিয়ম, করতে কত টাকা লাগে, প্রয়োজনীয় কাগজপত্র, পরীক্ষা এবং চেক করার সম্পূর্ণ গাইডলাইন
ড্রাইভিং লাইসেন্স আবেদন করার নিয়ম

বর্তমান সময়ে বাংলাদেশে মোটরযান চালানোর জন্য বৈধ ড্রাইভিং লাইসেন্স থাকা আইনত বাধ্যতামূলক। বাংলাদেশ রোড ট্রান্সপোর্ট অথরিটি (BRTA) পুরো লাইসেন্স প্রক্রিয়াটিকে ডিজিটাল করার ফলে এখন ঘরে বসেই অনলাইনে আবেদন করা সম্ভব। অনেকেই গুগলে সার্চ করেন যে কীভাবে নতুন লাইসেন্স করতে হয়, কী কী কাগজপত্র লাগে এবং কত টাকা খরচ হয়। এই আর্টিকেলে আমরা শিক্ষানবিশ লাইসেন্স থেকে শুরু করে স্মার্ট কার্ড পাওয়া পর্যন্ত প্রতিটি ধাপ বিস্তারিত আলোচনা করব।

ড্রাইভিং লাইসেন্স আবেদন ও যাচাই
বিআরটিএ সার্ভিস পোর্টালের মাধ্যমে অনলাইনে ড্রাইভিং লাইসেন্স সেবা

ড্রাইভিং লাইসেন্স করার প্রথম শর্ত হলো প্রথমে আপনাকে একটি শিক্ষানবিশ বা লার্নার (Learner) লাইসেন্সের জন্য আবেদন করতে হবে। নির্দিষ্ট সময় পর লিখিত, মৌখিক ও ব্যবহারিক পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হলেই কেবল মূল স্মার্ট কার্ড ড্রাইভিং লাইসেন্স পাওয়া যায়।

Table of Contents

অনলাইনে ড্রাইভিং লাইসেন্স আবেদন করার নিয়ম

বাংলাদেশে ড্রাইভিং লাইসেন্স আবেদন করার জন্য বিআরটিএ সার্ভিস পোর্টাল (BSP) ব্যবহার করতে হয়। আবেদনের ক্ষেত্রে অপেশাদার লাইসেন্সের জন্য ন্যূনতম বয়স ১৮ বছর এবং পেশাদার লাইসেন্সের জন্য ন্যূনতম ২১ বছর হতে হবে।

  1. প্রথমে বিআরটিএ সার্ভিস পোর্টাল (bsp.brta.gov.bd) ওয়েবসাইটে প্রবেশ করে জাতীয় পরিচয়পত্র (NID) ও মোবাইল নম্বর দিয়ে একটি অ্যাকাউন্ট রেজিস্ট্রেশন করুন।
  2. ড্যাশবোর্ডে লগইন করে 'ড্রাইভিং লাইসেন্সের জন্য আবেদন' অপশন থেকে শিক্ষানবিশ বা লার্নার লাইসেন্স ফরমটি সঠিকভাবে পূরণ করুন।
  3. প্রয়োজনীয় কাগজপত্র স্ক্যান করে আপলোড করুন এবং অনলাইনে নির্ধারিত লার্নার ফি পরিশোধ করে সাথে সাথে শিক্ষানবিশ লাইসেন্স প্রিন্ট করে নিন।

ড্রাইভিং লাইসেন্স করতে কি কি লাগে

অনলাইনে ফরম পূরণের পূর্বেই কিছু জরুরি ডকুমেন্টস স্ক্যান কপি হিসেবে প্রস্তুত রাখতে হয়। অনেকেই জানতে চান ড্রাইভিং লাইসেন্স করতে কি কি লাগে। আবেদনের জন্য নিচের কাগজপত্রগুলো বাধ্যতামূলক:

  • আবেদনকারীর জাতীয় পরিচয়পত্র (NID) কার্ডের কপি।
  • রেজিস্টার্ড ডাক্তার কর্তৃক প্রদত্ত মেডিকেল সার্টিফিকেট।
  • ন্যূনতম ৮ম শ্রেণি বা সমমান পাসের শিক্ষাগত যোগ্যতার সনদ।
  • সদ্য তোলা পাসপোর্ট সাইজের রঙিন ছবি।
  • বর্তমান ঠিকানা প্রমাণের জন্য সাম্প্রতিক ইউটিলিটি বিলের (বিদ্যুৎ, গ্যাস বা পানি) কপি।
  • রক্তের গ্রুপ (Blood Group) পরীক্ষার রিপোর্ট (প্রযোজ্য ক্ষেত্রে)।

ড্রাইভিং লাইসেন্স মেডিকেল ফরম ও সার্টিফিকেট

লাইসেন্স আবেদনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলো শারীরিক সুস্থতার প্রমাণপত্র বা ড্রাইভিং লাইসেন্স এর জন্য মেডিকেল সার্টিফিকেট। বিআরটিএ-এর অফিসিয়াল ওয়েবসাইট বা বিএসপি পোর্টাল থেকে নির্ধারিত ড্রাইভিং লাইসেন্স মেডিকেল ফরম ডাউনলোড করে প্রিন্ট করতে হবে। এরপর যেকোনো নিবন্ধিত এমবিবিএস (MBBS) চিকিৎসকের কাছ থেকে চোখ ও শারীরিক পরীক্ষা করিয়ে ফরমে স্বাক্ষর ও সিল নিতে হবে।

ড্রাইভিং লাইসেন্স করতে কত টাকা লাগে ও নির্ধারিত ফি

দালাল বা মধ্যস্বত্বভোগীদের এড়িয়ে চললে সরকারি নির্ধারিত খরচেই লাইসেন্স করা সম্ভব। সাধারণ মানুষের অন্যতম প্রধান জিজ্ঞাসা থাকে যে ড্রাইভিং লাইসেন্স করতে কত টাকা লাগে। বিআরটিএ কর্তৃক নির্ধারিত ড্রাইভিং লাইসেন্স ফি মূলত দুটি ধাপে পরিশোধ করতে হয়—প্রথমে লার্নার বা শিক্ষানবিশ ফি এবং পরীক্ষায় পাসের পর স্মার্ট কার্ড ইস্যু ফি।

লাইসেন্সের ধরন ও ধাপ বিবরণ আনুমানিক সরকারি ফি (ভ্যাট ও ডাক মাশুলসহ পরিবর্তনশীল)
লার্নার বা শিক্ষানবিশ লাইসেন্স ১ ক্যাটাগরি (শুধু মোটরসাইকেল বা শুধু হালকা যান) বিআরটিএ নির্ধারিত প্রাথমিক ফি
লার্নার বা শিক্ষানবিশ লাইসেন্স ২ ক্যাটাগরি (মোটরসাইকেল ও হালকা যান একত্রে) যৌথ ক্যাটাগরির নির্ধারিত ফি
অপেশাদার স্মার্ট কার্ড ফি ১০ বছর মেয়াদী মূল লাইসেন্স স্মার্ট কার্ড, ভ্যাট ও পোস্টাল চার্জসহ নির্ধারিত হার
পেশাদার স্মার্ট কার্ড ফি ৫ বছর মেয়াদী মূল লাইসেন্স (ডোপ টেস্ট ব্যতীত) স্মার্ট কার্ড, ভ্যাট ও পোস্টাল চার্জসহ নির্ধারিত হার

উল্লেখ্য যে, সরকারি ভ্যাট, কার্ড প্রিন্টিং চার্জ এবং ডাক বিভাগের ডেলিভারি ফি সময়ের সাথে বিআরটিএ কর্তৃক পরিমার্জন হতে পারে। সঠিক ও হালনাগাদ টাকার পরিমাণ বিএসপি পোর্টালে পেমেন্ট করার সময় স্বয়ংক্রিয়ভাবে প্রদর্শিত হয়।

ড্রাইভিং লাইসেন্স পরীক্ষার প্রশ্ন ও উত্তর এবং প্রস্তুতি

লার্নার লাইসেন্স পাওয়ার পর লার্নার কার্ডে উল্লেখিত তারিখে নির্ধারিত কেন্দ্রে পরীক্ষায় অংশ নিতে হয়। পরীক্ষায় মূলত তিনটি ধাপ থাকে: লিখিত পরীক্ষা, মৌখিক পরীক্ষা (ট্রাফিক সাইন ও সিগন্যাল চেনা) এবং ফিল্ড টেস্ট বা ব্যবহারিক পরীক্ষা। অনেকেই আগে থেকে প্রস্তুতির জন্য ড্রাইভিং লাইসেন্স পরীক্ষার প্রশ্ন ও উত্তর খুঁজে থাকেন।

পরীক্ষার প্রস্তুতির জন্য বিআরটিএ-এর ওয়েবসাইটে দেওয়া প্রশ্নব্যাংক পড়া সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য। এছাড়া গুগল প্লে-স্টোরে বিভিন্ন অনুশীলনমূলক ড্রাইভিং স্কুল app পাওয়া যায়, যেখান থেকে ট্রাফিক চিহ্ন এবং ড্রাইভিং লাইসেন্স পরীক্ষার প্রশ্ন অনুশীলন করা যেতে পারে। ওয়েবসাইটে প্রশ্নব্যাংক বা রোল নম্বর দ্রুত খুঁজতে কিবোর্ড শর্টকাট ব্যবহার করতে পারেন:

Ctrl + F

ড্রাইভিং লাইসেন্স পরীক্ষার রেজাল্ট জানার উপায়

লিখিত, মৌখিক ও ব্যবহারিক পরীক্ষা শেষ হওয়ার পর উত্তীর্ণ প্রার্থীদের তালিকা বিআরটিএ নোটিশ বোর্ডে বা অনলাইনে প্রকাশ করা হয়। আপনার ড্রাইভিং লাইসেন্স পরীক্ষার রেজাল্ট পজিটিভ হলে বিএসপি (BSP) প্রোফাইলে স্ট্যাটাস আপডেট হয়ে যায় এবং পরবর্তী ধাপে মূল স্মার্ট কার্ডের ফি জমা দেওয়ার অপশন চালু হয়। পেশাদার লাইসেন্সের ক্ষেত্রে এ পর্যায়ে সরকারি হাসপাতাল থেকে ডোপ টেস্ট (Dope Test) সনদ জমা দিতে হয়।

ড্রাইভিং লাইসেন্স চেক করার নিয়ম

পরীক্ষায় পাস করে ফি জমা দেওয়ার পর ই-ড্রাইভিং লাইসেন্স পাওয়া যায় এবং স্মার্ট কার্ড প্রিন্ট হতে কিছু সময় লাগে। এ অবস্থায় অ্যাপ্লিকেশন স্ট্যাটাস বা ড্রাইভিং লাইসেন্স চেক করার জন্য নিচের যেকোনো একটি মাধ্যম ব্যবহার করা যায়:

  • বিএসপি পোর্টাল: নিজের বিএসপি অ্যাকাউন্টে লগইন করে আবেদনের বর্তমান অবস্থা এবং ই-ড্রাইভিং লাইসেন্স ডাউনলোড করা যায়।
  • BRTA DL Checker অ্যাপ: অফিশিয়াল মোবাইল অ্যাপে রেফারেন্স নম্বর বা ডিএল নম্বর ও জন্মতারিখ দিয়ে লাইসেন্সের বৈধতা ও প্রিন্টিং স্ট্যাটাস দেখা যায়।
  • এসএমএস পদ্ধতি: মোবাইলের মেসেজ অপশনে গিয়ে DL Reference Number লিখে 26969 নম্বরে পাঠিয়েও ফিরতি মেসেজে স্ট্যাটাস জানা যায়।

ড্রাইভিং লাইসেন্স নবায়ন করার নিয়ম

প্রতিটি ড্রাইভিং লাইসেন্সের একটি নির্দিষ্ট মেয়াদ থাকে (অপেশাদার ১০ বছর এবং পেশাদার ৫ বছর)। মেয়াদ শেষ হওয়ার আগেই বা নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে লাইসেন্স রিনিউ করতে হয়। বর্তমানে ড্রাইভিং লাইসেন্স নবায়ন করার নিয়ম অত্যন্ত সহজ করা হয়েছে।

অপেশাদার লাইসেন্স নবায়নের জন্য পুনরায় পরীক্ষা দিতে হয় না; শুধুমাত্র বিএসপি পোর্টালে লগইন করে নতুন মেডিকেল সার্টিফিকেট আপলোড এবং নবায়ন ফি জমা দিলেই হয়। তবে পেশাদার লাইসেন্স নবায়নের ক্ষেত্রে পুনরায় ব্যবহারিক পরীক্ষা এবং নতুন ডোপ টেস্ট রিপোর্ট জমা দেওয়া বাধ্যতামূলক। মেয়াদ উত্তীর্ণ হওয়ার পর নবায়ন করলে বিআরটিএ-এর নিয়ম অনুযায়ী বছরভিত্তিক জরিমানা যুক্ত হয়।

ড্রাইভিং লাইসেন্স হারিয়ে গেলে করণীয়

অসাবধানতাবশত কখনো মূল স্মার্ট কার্ডটি নষ্ট হয়ে গেলে বা হারিয়ে গেলে বিচলিত হওয়ার কিছু নেই। ড্রাইভিং লাইসেন্স হারিয়ে গেলে করণীয় হলো প্রথমেই নিকটস্থ থানায় লাইসেন্স নম্বর উল্লেখ করে একটি সাধারণ ডায়েরি (GD) করা। এরপর ট্রাফিক ক্লিয়ারেন্স (প্রযোজ্য ক্ষেত্রে) এবং জিডির কপি বিএসপি পোর্টালে আপলোড করে প্রতিলিপি বা ডুপ্লিকেট লাইসেন্সের (Duplicate License) জন্য নির্ধারিত ফি জমা দিলে নতুন কার্ড ইস্যু করা হয়।

সড়কে নিরাপদ চলাচল নিশ্চিত করতে বৈধ ড্রাইভিং লাইসেন্স বহন করা এবং ট্রাফিক আইন মেনে চলা প্রতিটি চালকের নাগরিক দায়িত্ব। দালালচক্রের শরণাপন্ন না হয়ে সরাসরি বিআরটিএ সার্ভিস পোর্টালের মাধ্যমে নিজেই লাইসেন্সের আবেদন সম্পন্ন করুন।

সড়ক নিরাপত্তা নির্দেশিকা
বিআরটিএ সার্ভিস পোর্টাল (BSP Official Website)

সাধারণ জিজ্ঞাস্য (FAQ)

ড্রাইভিং লাইসেন্স করতে কি কি লাগে?

অনলাইনে আবেদনের জন্য জাতীয় পরিচয়পত্র (NID), রেজিস্টার্ড ডাক্তারের মেডিকেল সার্টিফিকেট, ন্যূনতম ৮ম শ্রেণি পাসের সনদ, পাসপোর্ট সাইজের ছবি, রক্তের গ্রুপের প্রমাণ এবং বর্তমান ঠিকানার ইউটিলিটি বিলের কপি লাগে।

ড্রাইভিং লাইসেন্স করতে কত টাকা লাগে?

ড্রাইভিং লাইসেন্সের খরচ মূলত দুটি ধাপে দিতে হয়: প্রথমে লার্নার লাইসেন্স ফি এবং পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়ার পর স্মার্ট কার্ড ও ভ্যাটসহ মূল লাইসেন্স ফি। ১ ক্যাটাগরি বা ২ ক্যাটাগরি এবং পেশাদার বা অপেশাদার ভেদে বিআরটিএ পোর্টালে নির্ধারিত সরকারি ফি প্রযোজ্য হয়।

ড্রাইভিং লাইসেন্স এর জন্য মেডিকেল সার্টিফিকেট কোথায় পাব?

বিআরটিএ-এর ওয়েবসাইট (brta.gov.bd) বা বিএসপি পোর্টাল থেকে নির্ধারিত মেডিকেল ফরম ডাউনলোড করে যেকোনো রেজিস্টার্ড এমবিবিএস (MBBS) ডাক্তারের কাছ থেকে স্বাস্থ্য পরীক্ষা করিয়ে সনদ নিতে পারবেন।

ড্রাইভিং লাইসেন্স পরীক্ষার রেজাল্ট কিভাবে দেখব?

পরীক্ষা দেওয়ার পর আপনার বিএসপি (BSP) অ্যাকাউন্টে লগইন করলে ড্যাশবোর্ডে পরীক্ষার ফলাফল দেখতে পাবেন। এছাড়া সংশ্লিষ্ট বিআরটিএ সার্কেল অফিসের নোটিশ বোর্ডেও উত্তীর্ণদের তালিকা প্রকাশ করা হয়।

অনলাইনে ড্রাইভিং লাইসেন্স চেক করার নিয়ম কী?

বিআরটিএ-এর অফিশিয়াল 'BRTA DL Checker' অ্যাপে অথবা bsp.brta.gov.bd পোর্টালে লগইন করে রেফারেন্স নম্বর বা লাইসেন্স নম্বর ও জন্মতারিখ দিয়ে সহজেই লাইসেন্স চেক করা যায়।

ড্রাইভিং লাইসেন্স নবায়ন করার নিয়ম কী?

বিএসপি পোর্টালে লগইন করে 'ড্রাইভিং লাইসেন্স নবায়ন' অপশনে গিয়ে নতুন মেডিকেল সার্টিফিকেট (পেশাদার হলে ডোপ টেস্টসহ) আপলোড ও নির্ধারিত নবায়ন ফি পরিশোধ করে অনলাইনেই নবায়ন করা যায়।

ড্রাইভিং লাইসেন্স হারিয়ে গেলে করণীয় কী?

লাইসেন্স হারিয়ে গেলে প্রথমে নিকটস্থ থানায় জিডি (GD) করতে হবে। এরপর জিডির কপি নিয়ে বিএসপি পোর্টালের মাধ্যমে ডুপ্লিকেট বা প্রতিলিপি লাইসেন্সের জন্য অনলাইনে আবেদন ও ফি জমা দিতে হবে।

Source: bsp.brta.gov.bd

Related Posts

Post a Comment

Join the conversation

Join the conversation